সঞ্চিতা চ্যাটার্জী, বিএস নিউজ এজেন্সি/পিআইবি, কলকাতা: মূল বিষয়সমূহ
* ১৮,০০০-এরও বেশি জনৌষধি কেন্দ্র ৫০-৮০% কম মূল্যে মানসম্মত জেনেরিক ওষুধ সরবরাহ করছে।
* সরকার ২০২৭ সালের মার্চের মধ্যে ২৫,০০০ কেন্দ্র খোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, যা ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেলের মাধ্যমে গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ওষুধের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করবে।
* নারী, তফশিলি জাতি/উপজাতি (SC/ST), দিব্যাঙ্গজন এবং প্রাক্তন সেনানিদের জনৌষধি কেন্দ্র স্থাপনে ২ লক্ষ টাকা পর্যন্ত বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে, যা অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্যোক্তা তৈরিতে সহায়ক হচ্ছে।
* মাত্র ১ টাকায় 'জনৌষধি সুবিধা' স্যানিটারি ন্যাপকিন এবং 'সুগম' (Sugam) মোবাইল অ্যাপের মতো উদ্যোগগুলি ঋতুকালীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবায় ডিজিটাল প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি করেছে।
ভূমিকা
অত্যন্ত কম মূল্যে মানসম্মত জেনেরিক ওষুধ সরবরাহের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবাকে সাশ্রয়ী করতে PMBJP চালু করা হয়েছিল। যেহেতু ব্যক্তিগত খরচের (out-of-pocket expenditure) একটি বড় অংশই ওষুধের পেছনে ব্যয় হয়, তাই এই প্রকল্পটি ব্র্যান্ডেড এবং ব্র্যান্ড-বহির্ভূত ওষুধের মূল্যের পার্থক্য দূর করার পাশাপাশি, অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধের জোগান নিশ্চিত করে।
জনৌষধি সপ্তাহ ২০২৬
দেশব্যাপী সচেতনতামূলক প্রচারের অংশ হিসেবে ‘জনৌষধি সপ্তাহ ২০২৬’ পালিত হচ্ছে, যা ৭ মার্চ অষ্টম ‘জনৌষধি দিবস’-এর উদযাপনের মাধ্যমে সমাপ্ত হয়। সাশ্রয়ী জেনেরিক ওষুধ এবং জনৌষধি কেন্দ্রের সেবা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে ভারতজুড়ে ২৫০টিরও বেশি স্থানে স্বাস্থ্য পরীক্ষা শিবিরের আয়োজন করা হয়েছিল।
ওষুধের গুণমান নিশ্চিতকরণ
PMBJP-র আওতায় সরবরাহ করা ওষুধগুলি কেবলমাত্র সেইসব প্রস্তুতকারকদের থেকে নেওয়া হয় যারা WHO-GMP মানদণ্ড মেনে চলে। বিতরণের আগে প্রতিটি ব্যাচ NABL-স্বীকৃত ল্যাবরেটরিতে কঠোরভাবে পরীক্ষা করা হয়, যা ওষুধের গুণমান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।
দেশজুড়ে সাশ্রয়ী ওষুধের বিস্তার
বর্তমানে দেশজুড়ে ১৮,০০০-এরও বেশি জনৌষধি কেন্দ্র চালু রয়েছে, যেখানে ২৯টি থেরাপিউটিক ক্যাটিগরিতে ২,১১০টি ওষুধ এবং ৩১৫টি সার্জিক্যাল ও মেডিকেল পণ্য পাওয়া যায়। প্রতিদিন প্রায় ১০-১২ লক্ষ মানুষ এই কেন্দ্রগুলি থেকে সেবা নিচ্ছেন এবং ব্র্যান্ডেড ওষুধের তুলনায় ৫০-৮০% কম মূল্যে ওষুধ কিনে উপকৃত হচ্ছেন। ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত এই প্রকল্পের মাধ্যমে নাগরিকদের আনুমানিক ৩৮,০০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হয়েছে।
ফ্র্যাঞ্চাইজি-ভিত্তিক সম্প্রসারণ
২০২৭ সালের মার্চের মধ্যে ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেলের মাধ্যমে ২৫,০০০ কেন্দ্র স্থাপনের লক্ষ্য নিয়েছে সরকার। উদ্যোক্তা, এনজিও, ট্রাস্ট, সোসাইটি এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলি এই কেন্দ্রের জন্য আবেদন করতে পারবে, যা শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ওষুধের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করবে।
নাগরিক-কেন্দ্রিক উদ্যোগ: জনৌষধি সুবিধা স্যানিটারি ন্যাপকিন
২০১৯ সালে প্রবর্তিত ‘জনৌষধি সুবিধা’ স্যানিটারি ন্যাপকিনের প্রতি প্যাডের মূল্য মাত্র ১ টাকা রাখা হয়েছে, যা নারীদের ঋতুকালীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা সুনিশ্চিত করেছে। এই অক্সো-বায়োডিগ্রেডেবল প্যাডগুলি পরিবেশবান্ধব উপায়ে বিনষ্ট করা সম্ভব। ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত এই উদ্যোগের অধীনে ১০০ কোটিরও বেশি প্যাড বিক্রি হয়েছে।
ডিজিটাল উদ্যোগ: জনৌষধি সুগম মোবাইল অ্যাপ্লিকেশান
স্বচ্ছতা এবং সহজলভ্যতা বাড়াতে ‘জনৌষধি সুগম’ অ্যাপটি ব্যবহারকারীদের নিকটস্থ কেন্দ্র খুঁজে পেতে, ওষুধের প্রাপ্যতা যাচাই করতে এবং জেনেরিক ও ব্র্যান্ডেড ওষুধের দামের তুলনা করতে সাহায্য করে। অ্যাপটি অ্যান্ড্রয়েড এবং আইওএস (iOS) প্ল্যাটফর্মে বিনামূল্যে পাওয়া যাচ্ছে।
প্রান্তিক পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা
পণ্যের তালিকা বৃদ্ধি, সরকারি হাসপাতালের সাথে সমন্বয়, পারফরম্যান্স-ভিত্তিক স্টকিং মানদণ্ড এবং গ্রামীণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে প্যাকস (PACS)-এর মতো সমবায় প্রতিষ্ঠানের সাথে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে এই কেন্দ্রগুলির স্থায়িত্ব ও কার্যকারিতা বাড়ানো হচ্ছে।
রেল স্টেশনে জনৌষধি কেন্দ্র
২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ১১৬টি রেল স্টেশনে জনৌষধি কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। এর ফলে, যাত্রী, পরিযায়ী শ্রমিক এবং স্বল্প আয়ের মানুষেজন যাতায়াতের সময় সহজেই সাশ্রয়ী ওষুধ সংগ্রহ করতে পারছেন।
জনৌষধি কেন্দ্র খোলার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োজনীয়তা
আবেদনকারীর কাছে ডি. ফার্মা (D. Pharma) বা বি. ফার্মা (B. Pharma) ডিগ্রিধারী একজন নিবন্ধিত ফার্মাসিস্ট এবং কমপক্ষে ১২০ বর্গফুট খুচরো বিক্রির জায়গা থাকতে হবে। SC/ST বা দিব্যাঙ্গজন ক্যাটাগরির আবেদনকারীদের জন্য নির্দিষ্ট নথিপত্র প্রয়োজন।
উৎসাহপ্রদায়ীর সাহায্যে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন
পরিচালনাকারীরা ওষুধের ওপর ২০% ট্রেড মার্জিন এবং পারফরম্যান্সের ওপর ভিত্তি করে ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত প্রণোদনা পান। এছাড়া, নারী, দিব্যাঙ্গজন, SC/ST উদ্যোক্তা এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষী জেলা বা প্রত্যন্ত অঞ্চলে কেন্দ্র স্থাপনকারীদের জন্য অতিরিক্ত এককালীন উৎসাহবর্ধক অর্থ দেওয়া হয়।
* বিশেষ উৎসাহপ্রদায়ী: যোগ্য উদ্যোক্তারা অতিরিক্ত ২ লক্ষ টাকা সহায়তা পেতে পারেন (আসবাবপত্রের জন্য ১.৫ লক্ষ এবং কম্পিউটার ও ডিজিটাল পরিকাঠামোর জন্য ৫০,০০০ টাকা)।
* সাধারণ উৎসাহবর্ধক: মাসিক ক্রয়ের ২০% হারে প্রতি মাসে সর্বোচ্চ ২০,০০০ টাকা পর্যন্ত (সর্বমোট ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত) উৎসাহভাতা দেওয়া হয়।
সরবরাহ শৃঙ্খল এবং লজিস্টিক ব্যবস্থাপনা
PMBI একটি আইটি-নির্ভর সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে যার অধীনে পাঁচটি কেন্দ্রীয় গুদাম এবং ৪১টি ডিস্ট্রিবিউটর কাজ করছে। ২০০টি উচ্চ-চাহিদাসম্পন্ন ওষুধের মজুত সুনিশ্চিত করা হয় এবং ডিজিটাল পূর্বাভাস ব্যবস্থার মাধ্যমে সংগ্রহ ও বিতরণ প্রক্রিয়াকে আরও দক্ষ করা হয়েছে।
উপসংহার
একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক, গুণমান নিশ্চিতকরণ, ডিজিটাল সরঞ্জাম এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্যোক্তা নীতির মাধ্যমে PMBJP সাশ্রয়ী ওষুধের প্রাপ্যতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছে। স্বাস্থ্যসেবার খরচ কমিয়ে এবং প্রান্তিক মানুষের কাছে সেবা পৌঁছে দিয়ে এই প্রকল্পটি ভারতে স্বাস্থ্যক্ষেত্রে সমতা আনার পথে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।