জনসংখ্যার ব্যাপক পরিসরে ডিজিটাল পরিকাঠামোর ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড স্থাপন।
ভূমিকা
সঞ্চিতা চ্যাটার্জী, বিএস নিউজ এজেন্সি/পিআইবি, কলকাতা, ৬ মার্চ, ২০২৬: ডিজিটাল পাবলিক পরিকাঠামো আজ রাষ্ট্র পরিচালনা, লেনদেন এবং জনসেবা প্রদানের পদ্ধতিকে নতুনভাবে রূপ দিচ্ছে। এই পরিবর্তনের ধারায় ভারত কেবলমাত্র ডিজিটাল ব্যবস্থার বড় ব্যবহারকারী থেকে জনসংখ্যার ব্যাপক পরিসরে প্রযোজ্য ডিজিটাল স্থাপত্য নির্মাতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। ভারতের এই দৃষ্টিভঙ্গির বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল এর ব্যাপকতা, উন্মুক্ততা এবং সমন্বিত কাঠামো। পরিচয়, পেমেন্ট এবং তথ্য আদানপ্রদান - এই তিনটি ক্ষেত্রকে আন্তঃকার্যক্ষম জনপরিকাঠামোর মাধ্যমে যুক্ত করা হয়েছে, যা কল্যাণমূলক পরিষেবা প্রদান, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং প্রশাসনিক সক্ষমতাকে শক্তিশালী করছে।
আন্তর্জাতিক ডিজিটাল মুহূর্ত : কেন ডিপিআই গুরুত্বপূর্ণ
ভারত অত্যন্ত কম ব্যয়ে ১৪০ কোটিরও বেশি মানুষের জন্য ডিজিটাল পাবলিক পরিকাঠামো নির্মাণ করেছে। এটি একটি উন্মুক্ত ও সহজলভ্য সংযোগ, যা বিধিনিষেধ-ভিত্তিক কাঠামো এবং বহুবিধ অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে অর্থনীতিকে আধুনিকীকরণ, প্রশাসনিক সংস্কার এবং মানুষের জীবনে পরিবর্তন আনতে সহায়তা করছে। ভারতের ক্ষেত্রে অন্তর্ভুক্তি, উদ্ভাবন এবং আস্থার নীতিগুলি ডিপিআই ব্যবস্থায় বাস্তব রূপ পেয়েছে। জনসংখ্যার ব্যাপক পরিসরে এবং পরিমাপযোগ্য প্রভাবের মাধ্যমে ভারত দেখিয়েছে যে ডিজিটাল ব্যবস্থা গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি, উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত করতে পারে।
ভারতের ডিপিআই-এর ভিত্তি : জ্যাম ত্রয়ী
ভারতের ডিজিটাল পাবলিক পরিকাঠামো রাতারাতি গড়ে ওঠেনি। এটি পরিচয়, ব্যাংকিং এবং সংযোগ ব্যবস্থার সুপরিকল্পিত সমন্বয়ের মাধ্যমে বিকশিত হয়েছে। এই সমন্বয়ই ‘জ্যাম ত্রয়ী’ নামে পরিচিত। জনধন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, আধার নিবন্ধন এবং মোবাইল ফোনের ব্যাপক ব্যবহার ভারতের ডিজিটাল রূপান্তরের ভিত্তি স্থাপন করেছে।
আধার
আধার দেশের বাসিন্দাদের জন্য বায়োমেট্রিক ভিত্তিক একটি ডিজিটাল পরিচয় প্ল্যাটফর্ম চালু করে। এর মাধ্যমে একক পরিচয় এবং নিরাপদ প্রমাণীকরণ সম্ভব হয়েছে, যা পরিষেবা প্রদানে দক্ষতা বৃদ্ধি করেছে। ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ১৪৪ কোটিরও বেশি আধার নম্বর জারি হয়েছে। এর ব্যবহার দৈনন্দিন ব্যবস্থায় গভীরভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। শুধু ২০২৪-২৫ সালেই ২,৭০৭ কোটিরও বেশি প্রমাণীকরণ লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে।
জনধন যোজনা
২০১৪ সালের আগস্ট মাসে চালু হওয়া এই উদ্যোগ বিশ্বের বৃহত্তম আর্থিক অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মসূচিগুলির অন্যতম হয়ে উঠেছে। ২০১৫ সালে অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ছিল ১৪.৭২ কোটি, যা ২০২৬ সালের মার্চে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৭.৭১ কোটি। জমার পরিমাণ ২০১৫ সালের মার্চে ১৫,৬৭০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২০২৬ সালের মার্চে হয়েছে ২.৯৪ লক্ষ কোটি টাকা। সুবিধাভোগীদের মধ্যে মোট ৩৯.৯৮ কোটি রুপে ডেবিট কার্ড বিতরণ করা হয়েছে, এর ফলে, মানুষের আর্থিক অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
মোবাইল ফোন ও সংযোগ ব্যবস্থা
সংযোগ ব্যবস্থাই এই ত্রিভুজকে সম্পূর্ণ করেছে। ভারতের প্রায় ৮৫.৫% পরিবারের অন্তত একটি স্মার্টফোন রয়েছে, ফলে মোবাইল ফোন আজ ব্যাংক, শ্রেণিকক্ষ এবং জনপরিষেবার প্রবেশদ্বার হয়ে উঠেছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষে দেশে বেতার টেলিফোন গ্রাহকের সংখ্যা পৌঁছায় ১২৫.৮৭ কোটিতে। পঞ্চম প্রজন্মের (৫জি) মোবাইল পরিষেবা এখন দেশের ৯৯.৯% জেলায় উপলভ্য, যা জনসংখ্যার প্রায় ৮৫% কে অন্তর্ভুক্ত করেছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে ৫.১৮ লক্ষ ৫জি বেস ট্রান্সসিভার স্টেশন স্থাপন করা হয়েছে।
ভারতের ডিপিআই স্ট্যাকের উত্থান
ভারতের ডিপিআই স্ট্যাক কয়েকটি মৌলিক ডিজিটাল ব্যবস্থার উপর ভিত্তি করে শুরু হয়ে ধীরে ধীরে উন্মুক্ত এপিআই (অ্যাপ্লিকেশন প্রোগ্রামিং ইন্টারফেস) এবং জনস্বার্থমূলক ডিজিটাল সম্পদের উপর নির্মিত একটি সমন্বিত জাতীয় কাঠামোতে পরিণত হয়েছে। ‘ইন্ডিয়া স্ট্যাক’ নামে পরিচিত এই ব্যবস্থা পরিচয়, তথ্য এবং পেমেন্টের মূল উপাদানগুলিকে জনসংখ্যার ব্যাপক পরিসরে ব্যবহারযোগ্য করেছে।
ডিজিটাল অর্থনৈতিক পরিকাঠামো
ইউনিফায়েড পেমেন্টস ইন্টারফেস (ইউপিআই)
ইউপিআই খুচরো পেমেন্ট ব্যবস্থাকে সহজ ও তাৎক্ষণিক ডিজিটাল অভিজ্ঞতায় রূপান্তর করেছে। এটি ব্যক্তি ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে তাৎক্ষণিক, আন্তঃকার্যক্ষম এবং নিরাপদ লেনদেন নিশ্চিত করে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ইউপিআইয়ের মাধ্যমে ২,১৭০ কোটি লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে, যার মোট মূল্য ২৮.৩৩ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি। বর্তমানে ৬৯১টি ব্যাংক ইউপিআই প্ল্যাটফর্মে যুক্ত রয়েছে। আইএমএফ ২০২৫ সালের জুন মাসের প্রতিবেদনে ইউপিআইকে লেনদেনের সংখ্যার ভিত্তিতে বিশ্বের বৃহত্তম দ্রুত খুচরো পেমেন্ট ব্যবস্থা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
পাবলিক ফাইনান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (পিএফএমএস)
পিএফএমএস সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা এবং নিয়ন্ত্রণকে শক্তিশালী করেছে। এটি একটি ওয়েবভিত্তিক অনলাইন লেনদেন ব্যবস্থা, যা সরকারি তহবিলের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ এবং বাস্তবায়নকারী সংস্থা ও সুবিধাভোগীদের কাছে বৈদ্যুতিন ব্যবস্থায় অর্থপ্রদান নিশ্চিত করে।
ওপেন নেটওয়ার্ক ফর ডিজিটাল কমার্স (ওএনডিসি)
২০২২ সালে চালু হওয়া ওএনডিসি একটি উন্মুক্ত নেটওয়ার্ক, যা একক মার্কেটপ্লেসের পরিবর্তে আন্তঃকার্যক্ষম প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ক্রেতা ও বিক্রেতাকে যুক্ত করে ডিজিটাল বাণিজ্যকে আরও গণতান্ত্রিক করে তুলছে।
গভর্নমেন্ট ই-মার্কেটপ্লেস (জিইএম)
২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৩.২৭ কোটি অর্ডার প্রক্রিয়াকরণ হয়েছে, যার মোট মূল্য ১৬.৪১ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি। এর মধ্যে পরিষেবা ক্ষেত্রে ৭.৯৪ লক্ষ কোটি টাকা এবং পণ্যক্ষেত্রে ৮.৪৭ লক্ষ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। প্ল্যাটফর্মে ১০,৮৯৪টিরও বেশি পণ্য বিভাগ এবং ৩৪৮টি পরিষেবা বিভাগ রয়েছে। মোট ১.৬৭ লক্ষেরও বেশি ক্রেতা সংস্থা এতে যুক্ত হয়েছে। বস্তুত, ২৪ লক্ষেরও বেশি বিক্রেতা ও পরিষেবা প্রদানকারী নিবন্ধিত, যার মধ্যে ১১ লক্ষেরও বেশি ক্ষুদ্র ও ছোট উদ্যোগ রয়েছে।
নাগরিক পরিষেবা প্রদানের মঞ্চ
ডিজিলকার
২০১৫ সালে চালু হওয়া ডিজিলকার নাগরিকদের জন্য একটি নিরাপদ ডিজিটাল নথি সংরক্ষণ ব্যবস্থা চালু করে। এর মাধ্যমে মানুষ সম্মতিভিত্তিক ব্যবস্থায় যাচাইকৃত নথি সংরক্ষণ, ব্যবহার ও ভাগ করতে পারেন। ২০২৬ সালের ৫ মার্চ পর্যন্ত ডিজিলকারে ব্যবহারকারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৭.৬৩ কোটি। ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ৯৫০ কোটিরও বেশি নথি এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে জারি হয়েছে।
উমং
২০১৭ সালে চালু হওয়া ইউনিফায়েড মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন ফর নিউ এজ গভর্ন্যান্স (উমং) মোবাইল গভর্ন্যান্সকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে তৈরি। এটি একটি একক প্ল্যাটফর্ম যেখানে নাগরিকরা কেন্দ্র, রাজ্য এবং স্থানীয় প্রশাসনের বিভিন্ন পরিষেবা গ্রহণ করতে পারেন।
ই-কোর্টস
ই-কোর্টস প্রকল্পটি বিচার বিভাগে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর জন্য একটি জাতীয় মিশনভিত্তিক উদ্যোগ। ২০১১ থেকে ২০১৫ সালের প্রথম পর্যায়ে ১৪,২৪৯টি আদালত কম্পিউটারাইজড করা হয় এবং ১৩,৬৮৩টি আদালতে লোকাল এরিয়া নেটওয়ার্ক স্থাপন করা হয়।
স্বাস্থ্য ও পুষ্টি ব্যবস্থার ডিজিটাল পরিকাঠামো
কোউইন
২০২১ সালের ১৬ জানুয়ারি কোভিড-১৯ টিকাকরণ কর্মসূচির ডিজিটাল ভিত্তি হিসেবে কোউইন চালু হয়। মোট ২২০ কোটিরও বেশি টিকার ডোজ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এটি বিশ্বের বৃহত্তম টিকাকরণ কর্মসূচিগুলির একটি পরিচালনা করেছে।
ই-সঞ্জীবনী
২০১৯ সালের নভেম্বর মাসে চালু হওয়া এই টেলিমেডিসিন পরিষেবা দূরবর্তী অঞ্চলে চিকিৎসা পরিষেবা পৌঁছে দিচ্ছে। ২০২৬ সালের ৫ মার্চ পর্যন্ত ৪৫.৪২ কোটি রোগী এই পরিষেবা গ্রহণ করেছেন।
পোষণ ট্র্যাকার
২০২১ সালের ১ মার্চ চালু হওয়া পোষণ ট্র্যাকার পুষ্টি পর্যবেক্ষণের জন্য একটি ডিজিটাল প্রশাসনিক ব্যবস্থা। ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ১৪.০৩ লক্ষ অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র এবং ৮.৯০ কোটি সুবিধাভোগী এতে নিবন্ধিত।
ভারতের ডিপিআই কূটনীতি
ভারতের ডিপিআই সহযোগিতা ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’ দর্শনের উপর ভিত্তি করে। এর অর্থ পৃথিবী এক পরিবার। এই ভাবনার ভিত্তিতে ভারত আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ডিজিটাল সহযোগিতা প্রসারিত করছে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ভারত ২৪টি দেশের সঙ্গে ইন্ডিয়া স্ট্যাক এবং ডিজিটাল পাবলিক পরিকাঠামো বিষয়ে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে। এই সহযোগিতার মাধ্যমে ডিজিটাল পরিচয়, পেমেন্ট ব্যবস্থা, তথ্য আদানপ্রদান কাঠামো এবং জনপরিষেবা প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলতে সহায়তা করা হচ্ছে।
সীমান্তপারে ইউপিআই সম্প্রসারণ
ইউপিআই এখন সংযুক্ত আরব আমিরশাহী, সিঙ্গাপুর, ভুটান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ফ্রান্স, মরিশাস এবং কাতার-সহ আটটি দেশে চালু হয়েছে।
জি-২০ ঘোষণাপত্র
২০২৩ সালে জি-২০ সভাপতিত্বের সময় ভারত ডিজিটাল পাবলিক পরিকাঠামোকে উন্নয়নের মূল উপাদান হিসেবে তুলে ধরে। নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্রে ডিপিআই-কে উন্নয়ন ত্বরান্বিতকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
উপসংহার
ভারতের ডিজিটাল পাবলিক পরিকাঠামোর যাত্রা দেখায় যে ডিজিটাল যুগে উন্নয়ন ও প্রশাসনের ধারণা কীভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে। আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং পরিচয় ব্যবস্থার সম্প্রসারণ দিয়ে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ আজ একটি সমন্বিত ডিজিটাল কাঠামোতে পরিণত হয়েছে, যা অর্থনীতি, জনপরিষেবা এবং প্রশাসনিক সক্ষমতাকে শক্তিশালী করছে। ভারতের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করেছে যে, ব্যাপক পরিসরে প্রযুক্তির ব্যবহার আস্থা ও স্বচ্ছতা বজায় রেখেই করা সম্ভব। জনকল্যাণমূলক উদ্দেশ্যের সঙ্গে প্রযুক্তিকে যুক্ত করে ভারত দেখিয়েছে যে, ডিজিটাল ব্যবস্থা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি, অর্থনৈতিক উন্নয়নেও গতি আনতে পারে।