শক্তির উৎসের পরিবর্তিত পরিসর।

শক্তির উৎসের পরিবর্তিত পরিসর
সঞ্চিতা চ্যাটার্জী, বিএস নিউজ এজেন্সি, পিআইবি, নয়াদিল্লি, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬: প্রতিদিন ঘর, বিদ্যালয়, কারখানা ও হাসপাতালে আলো জ্বলে ওঠে। স্কুলের শ্রেণীকক্ষে পাখা ঘোরে, মাঠে জলসেচের পাম্প চলে, যাত্রীবাহী ট্রেন ছুটে যায়। এই সবকিছুর পিছনেই একটি বিস্তৃত ও সুসংগঠিত শক্তি ব্যবস্থা নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে।

ভারত বর্তমানে বিশ্বের শীর্ষ তিন শক্তি ব্যবহারকারী দেশের অন্যতম। প্রতি বছর-ই বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে। মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ২০২৩–২৪ সালে ১,৭৩৯.০৯ বিলিয়ন ইউনিট থেকে ২০২৪–২৫ সালে ১,৮২৯.৬৯ বিলিয়ন ইউনিটে উন্নীত হয়েছে। বৃদ্ধি ৫.২১ শতাংশ। ২০২৫–২৬ সালের জন্য উৎপাদন লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছে ২,০০০.৪ বিলিয়ন ইউনিট।

নবীকরণযোগ্য শক্তির প্রসার, জাতীয় হরিৎ হাইড্রোজেন মিশন, সুস্থায়ী পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের প্রয়োজনে আইন সংস্কার, শক্তির দক্ষতা বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্কার এবং ডিজিটাল শক্তি পরিকাঠামো গড়ে তোলার মতো উদ্যোগ এই পরিবর্তনকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

নবীকরণযোগ্য শক্তির প্রসার: সম্প্রসারণ থেকে আন্তর্জাতিক নেতৃত্ব

নীতিনির্ভর পরিকল্পনার মাধ্যমে নবীকরণযোগ্য শক্তিতে দ্রুত অগ্রগতি হয়েছে। আন্তর্জাতিক নবীকরণযোগ্য শক্তি সংস্থার ২০২৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মোট স্থাপিত নবীকরণযোগ্য শক্তি ক্ষমতায় ভারত আন্তর্জাতিকভাবে চতুর্থ স্থানে রয়েছে।

প্রধান উদ্যোগ

প্রধানমন্ত্রী সূর্য ঘর প্রকল্পের মাধ্যমে ২৩.৯ লক্ষ পরিবার ছাদে সৌর ব্যবস্থা স্থাপন করেছে। মোট ৭ গিগাওয়াট বিতরণকৃত পরিচ্ছন্ন শক্তি যুক্ত হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী কিষান উর্জা সুরক্ষা ও উন্নয়ন মহাভিযান কৃষিক্ষেত্রে সৌরায়নকে উৎসাহিত করছে। ডিজেলের উপর নির্ভরতা কমছে। আগামী ৩১ মার্চ ২০২৬-এর মধ্যে ১৪ লক্ষ স্বতন্ত্র পাম্প স্থাপনের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

মোট ১৩টি রাজ্যে ৫৫টি সৌর উদ্যান অনুমোদিত হয়েছে। প্রায় ৪০ গিগাওয়াট ক্ষমতা নির্ধারিত হয়েছে।

উৎপাদন সংযুক্ত প্রণোদনা প্রকল্পে ২৪,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে। দেশীয় সৌর উৎপাদন শক্তিশালী হচ্ছে। আমদানি নির্ভরতা কমছে।

হরিৎ হাইড্রোজেন: শক্তির নতুন দিগন্ত

ইস্পাত, সার, শোধনাগার, জাহাজ পরিবহণ ও ভারী পরিবহণের মতো ক্ষেত্রে নির্গমন হ্রাস দুরূহ। এই ক্ষেত্রগুলিতে হরিৎ হাইড্রোজেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে।

২০২৩ সালে শুরু হওয়া জাতীয় হরিৎ হাইড্রোজেন মিশনের অধীনে ২০৩০ সালের মধ্যে বছরে ৫ মিলিয়ন মেট্রিক টন উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

এই মিশন রূপায়িত হওয়ার ফলে ৮ লক্ষ কোটির বেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বস্তুত, ১ লক্ষ কোটির বেশি জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানি হ্রাস পাবে।

২০৩০ সালের মধ্যে বছরে প্রায় ৫০ মিলিয়ন মেট্রিক টন গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন এড়ানো সম্ভব হবে।

পারমাণবিক শক্তি: আইন সংস্কার ও বেসলোড সম্প্রসারণ

পারমাণবিক শক্তি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করে। গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন অত্যন্ত কম। নবীকরণযোগ্য শক্তির সম্প্রসারণের সঙ্গে গ্রিড স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পারমাণবিক শক্তি গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমানে ভারতের পারমাণবিক ক্ষমতা ৮.৭৮ গিগাওয়াট। নতুন রিয়্যাক্টর নির্মাণাধীন। ২০৩১–৩২ সালের মধ্যে ক্ষমতা ২২.৩৮ গিগাওয়াটে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

দীর্ঘমেয়াদী পারমাণবিক শক্তি মিশনের লক্ষ্য ২০৪৭ সালের মধ্যে ১০০ গিগাওয়াট অর্জন। পরিচ্ছন্ন শক্তি ও শক্তি নিরাপত্তা কৌশলের সঙ্গে এই সম্প্রসারণ সামঞ্জস্যপূর্ণ।

শক্তি দক্ষতা ও কার্বন বাজার শক্তিশালীকরণ

পারফর্ম, অ্যাচিভ অ্যান্ড ট্রেড প্রকল্প থেকে কার্বন ক্রেডিট ট্রেডিং স্কিমে রূপান্তর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কার্বন ক্রেডিট ট্রেডিং স্কিমের অধীনে নির্গমন-নির্ভর শিল্পগুলির জন্য গ্রিনহাউস গ্যাস ঘনত্বের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। নির্ধারিত লক্ষ্য অতিক্রম করলে সংস্থাগুলি বাণিজ্যযোগ্য কার্বন ক্রেডিট অর্জন করে। এই ক্রেডিট কেনাবেচা করা যায়।

দক্ষতা বৃদ্ধির কারণে বাজারভিত্তিক উৎসাহ তৈরি হয়েছে।

গৃহস্থালি স্তরে শক্তি দক্ষতা কর্মসূচি চালু রয়েছে। দক্ষ যন্ত্রপাতি ও আলোক ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে। উজালা কর্মসূচির মাধ্যমে ৩৬.৮৭ কোটি এলইডি বাল্ব বিতরণ করা হয়েছে। এর ফলে, বছরে ৪৭,৮৮৩ মিলিয়ন কিলোওয়াট-ঘণ্টা শক্তি সাশ্রয় হয়েছে। বছরে ৩.৮৮ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন হ্রাস পেয়েছে।

বিদ্যুৎ ক্ষেত্র সংস্কার ও বিতরণ ব্যবস্থার শক্তিশালীকরণ

বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি, সঞ্চালন, বিতরণ, বিলিং ও ব্যবস্থাপনা দক্ষ হওয়া জরুরি। বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

দীনদয়াল উপাধ্যায় গ্রাম জ্যোতি যোজনা, সমন্বিত শক্তি উন্নয়ন প্রকল্প এবং প্রধানমন্ত্রী সহজ বিদ্যুৎ হর ঘর যোজনার অধীনে প্রায় ১.৮৫ লাখ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে।

মোট ১৮,৩৭৪টি গ্রামে বিদ্যুতায়ন সম্পন্ন হয়েছে।

মোট ২.৮৬ কোটি পরিবার নতুন সংযোগ পেয়েছে। দেশে বিদ্যুৎ প্রবেশাধিকার উল্লেখযোগ্যভাবে বিস্তৃত হয়েছে।

আন্তর্জাতিক নেতৃত্ব ও কৌশলগত অংশীদারিত্ব
জি-২০ শক্তি রূপান্তর কার্যদলে ভারত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও শক্তি নিরাপত্তায় সহযোগিতা জোরদার হয়েছে। জি-২০ সভাপতিত্বকালে ভারত আন্তর্জাতিক জৈবজ্বালানি জোট শুরু করেছে। বর্তমানে ২৫টি দেশ ও ১২টি আন্তর্জাতিক সংস্থা এতে যুক্ত রয়েছে। সাশ্রয়ী ও স্বল্প-কার্বন জৈবজ্বালানির প্রসার লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছে।

২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক শক্তি দক্ষতা হাবে যোগ দিয়ে শক্তি দক্ষতায় সহযোগিতা আরও জোরদার হয়েছে। দেশীয় উদ্যোগ আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়েছে।

উপসংহার

ভারতের শক্তি যাত্রা আর একক উৎসনির্ভর নয়। সৌর উদ্যান, ছাদে সৌর ব্যবস্থা স্থাপন, হরিৎ হাইড্রোজেন উদ্যোগ, আধুনিক পারমাণবিক কাঠামো, স্মার্ট মিটার ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এই পরিবর্তনের অংশ।

নবীকরণযোগ্য শক্তি সম্প্রসারণ, জাতীয় হরিৎ হাইড্রোজেন মিশনের অগ্রগতি, বিতরণ সংস্থার শক্তিশালীকরণ এবং শক্তি ব্যবস্থার ডিজিটাল রূপান্তর সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ নির্দেশ করে। এই রূপান্তর ধাপে ধাপে এগিয়েছে। নীতি সংস্কার, পরিকাঠামো বিনিয়োগ, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এর ভিত্তি।

২০৭০ সালের মধ্যে নেট জিরো লক্ষ্যের পথে অগ্রসর হচ্ছে ভারত। বৃদ্ধি ও সুস্থায়ী উন্নয়ন সমান্তরালভাবে এগোচ্ছে। গৃহ, কারখানা ও তথ্যকেন্দ্রের শক্তি একটি স্থিতিস্থাপক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে সরবরাহ হবে।

ভারত কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে না। উৎপাদন, সরবরাহ ও অংশীদারিত্বের কাঠামো পুনর্গঠন করছে। নিরাপদ, সুস্থায়ী ও আত্মনির্ভর ভবিষ্যৎ নির্মাণে এই পথ নির্ধারিত হয়েছে।


Tags