উদীয়মান ভারতের বাজেট : বিকশিত ভারতের চালিকাশক্তি হিসেবে বস্ত্রশিল্প।



শ্রী গিরিরাজ সিং। ছবি সঞ্চিতা চ্যাটার্জী/বিএস নিউজ এজেন্সি।


সঞ্চিতা চ্যাটার্জী বিএস নিউজ এজেন্সি: বিশ্বজুড়ে যখন এক অনিশ্চয়তার আবহ বিরাজ করছে, সেই পরিস্থিতিতে ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের বিকশিত ভারত বাজেট আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছে। এই বাজেট স্পষ্টতই সংস্কারের বার্তা বহন করে। আজ বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবে ভারত বিবেচিত হচ্ছে। দ্রুততম বিকাশশীল অর্থনীতি হিসেবে পরিচিত ভারত খুব শীঘ্রই তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে উন্নীত হবে। ৪.৫ লক্ষ কোটি মার্কিন ডলারের সমতুল এই অর্থনীতির মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের বৃদ্ধি ৭.২ শতাংশ হবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ ৭৫ হাজার কোটি মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। ২০১৪ সালে মূলধনী ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ১.৯ লক্ষ কোটি টাকা। ২০২৬ সালে তা ছয়গুণ বৃদ্ধি পেয়ে ১২.২১ লক্ষ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এবারের বাজেটে পরিকাঠামোর মাধ্যমে উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। এছাড়াও, ম্যাক্রো-অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ও দেশের উন্নয়নের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক স্তরে সুস্থায়ী আস্থা সহায়ক হচ্ছে। বাজেট একটি সমন্বিত উন্নয়ন এবং বিপুল সংখ্যক কর্মসংস্থানের কথা ভেবে তৈরি করা হয়েছে। এই বাজেটে উৎপাদন ক্ষেত্রকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে যার মূলে থাকছে বস্ত্রশিল্প।

বিকশিত ভারতের চালিকাশক্তি হিসেবে চিরায়ত শক্তি থেকে কৌশলগতভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে বস্ত্রশিল্প – 

প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদীর দূরদর্শী নেতৃত্বের ফলে গত এক বছরে বস্ত্রশিল্পের ক্ষেত্রে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ভারত ১৮টি অবাধ বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করতে চলেছে। ফলস্বরূপ, ৮০ হাজার কোটি মার্কিন ডলারের এক আন্তর্জাতিক আমদানি বাজারে ভারত ৪৬ হাজার ৬০০ কোটি মার্কিন ডলার মূল্যের বস্ত্রশিল্পের বাজারের সুযোগ পাবে। আগামীদিনে এর সঙ্গে ১১ হাজার কোটি ডলারের মার্কিন বাজার যুক্ত হবে। ভারত-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য চুক্তি সম্প্রতি ঘোষিত হয়েছে। এর ফলে, গত বছরের তুলনায় এ বছর রপ্তানি বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। 

আন্তর্জাতিক স্তরে QCO-র নিয়মাবলীগুলি শিথিল হয়েছে। আবার, দেশেও জিএসটি-র সংস্কার করা হয়েছে। ফলে, বস্ত্রশিল্পের আগামীদিনে সুবিধা হবে। ২০২৬ সালের বাজেট এক্ষেত্রে আরও সহায়ক হবে। কটন প্রোডাক্টিভিটি মিশন-এর মতো বৃহদাকারের আর্থিক সংস্কার এক্ষেত্রে সহায়ক হবে। দীর্ঘদিন ধরে বস্ত্রশিল্পকে কল্যাণমূলক উদ্যোগ হিসেবে বিবেচনা করা হত। কিন্তু, এখন বস্ত্রশিল্পের অবস্থান পরিবর্তিত হয়েছে। বর্তমানে একে মূল শিল্পগুলির মধ্যে একটি বলে বিবেচনা করা হয়। ফলে, আগামীদিনে এই শিল্প আরও বেশি প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে পারবে। জাতীয় উন্নয়নের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি এক ভূমিকাও পালন করা সম্ভব হবে। 

সরকারের গৃহীত উদ্যোগগুলি অত্যন্ত স্পষ্ট। বর্তমানে দেশের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের ২.৩ শতাংশ বস্ত্রবয়ন শিল্প থেকে আসে। অথচ, দেশের মোট শিল্পোৎপাদনের ১২ শতাংশই এই ক্ষেত্রের অবদান। ৫ কোটি ২০ লক্ষ নাগরিক বস্ত্রশিল্পের ওপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ, এই শিল্প অর্থনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। বিশ্বের বাজারে ভারতের বস্ত্রশিল্প ৪ শতাংশ দখল করে রয়েছে। সঙ্গত কারণেই এই শিল্পের প্রসার ঘটানোর যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। সরকার তাই একটি মধ্য-মেয়াদি উচ্চাকাঙ্ক্ষী উদ্যোগ নিয়ে এগোচ্ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে বস্ত্রশিল্পের আর্থিক পরিমাণ দাঁড়াবে ৩৫ হাজার কোটি মার্কিন ডলার। এই শিল্পের ফলে রপ্তানির পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে ১০ হাজার কোটি মার্কিন ডলার। 

বস্ত্রশিল্প সংস্কারে যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তার প্রথম স্তম্ভ হিসেবে মূল্যযুক্ত শৃঙ্খলকে অন্তর্ভুক্ত করতে নানা ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে বস্ত্রশিল্পের জন্য কাঁচামালের চাহিদা ২৩ এমএমটি-তে পৌঁছবে। এক্ষেত্রে প্রাকৃতিক সুতোর যেমন প্রয়োজন হবে, পাশাপাশি কৃত্রিম সুতোরও চাহিদা থাকবে। অথচ, তুলোর দাম বাজারে যথেষ্ট ওঠা-নামা করে। এই দামের ২৫-৩০ শতাংশ সংশ্লিষ্ট শিল্পের লাভ-ক্ষতির হিসেবে পরিবর্তন ঘটায়। বিশেষ করে, অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের ক্ষেত্রে উৎপাদন সংক্রান্ত পরিকল্পনা এবং রপ্তানি মূল্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, আবার কাঁচামালের চাহিদা বাড়ছে। এই দুটি বিষয়কে বিবেচনা ২০২৬-এর বাজেটে ন্যাশনাল ফাইবার স্কিম-এর ঘোষণা করা হয়েছে। এর ফলে, কৃত্রিম তুলো এবং আধুনিক যুগের তুলো মূল্যযুক্ত শৃঙ্খলে যেমন প্রভাব বিস্তার করবে, পাশাপাশি উৎপাদিত পণ্যসামগ্রীও এই শৃঙ্খলে অন্তর্ভুক্ত হবে। কাঁচামালের সরবরাহে যাতে স্থিতাবস্থা বজায় থাকে তার জন্য নির্দিষ্ট কিছু পরিকল্পনার কথা এবারের বাজেটে উল্লেখ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট শিল্পের সুস্থায়ীভাবে প্রসার ঘটানোর মধ্য দিয়ে ভবিষ্যতের চাহিদা পূরণ সম্ভব। এই বিষয়টি নিশ্চিত করতে রপ্তানিকারকদের উৎপাদিত পণ্যের দাম নির্ধারণে স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। 

বস্ত্রশিল্পে একটি বড় সমস্যা হল বিভিন্ন ক্লাস্টারের ওপর নির্ভর করে থাকা। এর ফলে, উৎপাদনের ক্ষেত্রে নানা সমস্যা দেখা দেয়। উৎপাদনের দক্ষতা বাড়াতে এবং পণ্য পরিবহণে ব্যয় হ্রাসের জন্য এই ব্যবস্থার আধুনিকীকরণের প্রয়োজন। দেশজুড়ে ২০০টি শিল্প তালুকের আধুনিকীকরণের প্রস্তাব এবারের বাজেটে রাখা হয়েছে। ক্লাস্টার-ভিত্তিক উৎপাদনের ব্যবস্থাপনা শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতাকে ২০-২৫ শতাংশ বৃদ্ধি করে। আবার, পণ্য পরিবহণের ব্যয় প্রায় ৩০ শতাংশ হ্রাস পায়। মেগা টেক্সটাইল পার্কগুলিতে বিনিয়োগের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে ব্যয় যেমন হ্রাস করা সম্ভব হবে, পাশাপাশি ক্ষুদ্র উৎপাদকদের না সরিয়ে এর উৎপাদনশীলতাও বৃদ্ধি করা যাবে।

বস্ত্রশিল্পের সংস্কারমুখী উদ্যোগের মূলে রয়েছে আরও বেশি করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং কর্মীগোষ্ঠীর যে কোনো পরিস্থিতিতে সামিল হওয়ার মানসিকতা। মূলধন-ভিত্তিক শিল্পের থেকে বস্ত্রশিল্পে তিনগুণ বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব। তাই, মূল্যশৃঙ্খলে দক্ষতার বিকাশ ঘটানো এবং আরও বেশি করে কর্মী নিয়োগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ক্লাস্টার-ভিত্তিক উন্নয়নকে সহায়তা করার মধ্য দিয়ে বস্ত্রশিল্পের প্রসার ঘটবে। ফলে, কর্মসংস্থান বাড়বে। আগামী পাঁচ বছরে এই শিল্পে আরও ২-৩ কোটি মানুষের জীবিকার সংস্থান হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই প্রয়াসে ‘সমর্থ ২.০’ গতি নিয়ে এসেছে। ১৫ লক্ষ কর্মীকে বস্ত্রশিল্পের চাহিদা অনুসারে প্রশিক্ষণের জন্য ২০২৬-৩১ সময়কালে ২,৮০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। এই উদ্যোগে এনআইএফটি, আইআইটি, আইআইএইচটি, আইটিআই এবং এসভিপিআইএসটিএম-এর মতো সংস্থাগুলির সঙ্গে অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা হচ্ছে। ফলে, প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে উৎপাদন বৃদ্ধি করার ক্ষেত্রে আরও একধাপ এগোনো সম্ভব হবে। ২০৩০ সালের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে দক্ষ কর্মীর সংখ্যা ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি করাই এর লক্ষ্য।

কর্মসংস্থান এবং দক্ষতা বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে এই শিল্পে সুস্থায়ী উন্নয়ন নিশ্চিত হবে। বস্ত্রশিল্পের শিল্পোদ্যোগীদের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা এবং শিল্পের প্রসার ঘটানোর জন্য আর্থিক ক্ষমতা থাকতে হবে। অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পোদ্যোগকে বস্ত্রশিল্পের মেরুদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করে এবারের বাজেটে বিশেষ প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এই শিল্প সংস্থাগুলির ক্ষেত্রে বড় সমস্যা হল মূলধন। তাই, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পোদ্যোগ সংক্রান্ত এসএমই গ্রোথ ফান্ডে ১০ হাজার কোটি টাকার সংস্থান থাকছে। এর ফলে, TReDS প্ল্যাটফর্মকে শক্তিশালী করা হবে। মূলধনের যোগানে যাতে সমস্যা না হয়, সেই বিষয়টি বিবেচনা করে সরকারকেও বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দাম দ্রুত মিটিয়ে দিতে হবে। দেখা গেছে, অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পোদ্যোগের সংস্থাগুলিকে সরকার যদি দেরিতে দাম মেটায়, তাহলে প্রতি বছর প্রায় ১৫ শতাংশ মূলধন সংক্রান্ত সমস্যায় পড়ে এই সংস্থাগুলি। ভারতের গ্রামাঞ্চল এবং আধা-গ্রাম আধা-শহর অঞ্চলের প্রায় ৬৫ লক্ষ মানুষ হস্তচালিত তাঁতশিল্পের সঙ্গে যুক্ত। এক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী জাতীয় তন্তুবায় কর্মসূচি গ্রহণের মধ্য দিয়ে সংশ্লিষ্ট শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের সহায়তা করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। ‘মহাত্মা গান্ধী গ্রাম স্বরাজ উদ্যোগ’ এবং ওডিওপি ভিশনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য সহায়তা করা হবে। এর ফলে তাঁরা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাবেন। ফলস্বরূপ, এই শিল্পে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে। Tex Eco ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বস্ত্রশিল্পে সুস্থায়ী এক উদ্যোগ বজায় রাখতে এবারের বাজেটে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর ফলে, মূল্যশৃঙ্খলে যেমন প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়াকে যুক্ত করা যাবে, পাশাপাশি ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে রপ্তানির বাজারে টিকে থাকার জন্য বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় সামিল হতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলির সুবিধা হবে।

বাজেটের অঙ্ক থেকে জাতীয় স্তরের দিশা – বিকশিত ভারতের পথে

এই প্রথমবার বস্ত্রশিল্পকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই শিল্পকে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শিল্পোদ্যোগের চালিকাশক্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এর ফলে, ২০২০-৩০ সময়কালে দেশজুড়ে সংশ্লিষ্ট শিল্পে যে ৫ কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে চলেছে, সেটি আসলে ভারতের শ্রমক্ষেত্রে উন্নয়নের কৌশল। বিকশিত ভারতের এই বাজেট বস্ত্রশিল্পের সঙ্গে যুক্ত নতুন উদ্যোগ বা স্টার্ট-আপ প্রতিষ্ঠানগুলির জন্য সহায়ক হবে। কর্মসংস্থান, দক্ষতা এবং সুস্থায়ী উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়ে এই বাজেট একটি সর্বাঙ্গীণ উন্নয়নের পথ দেখাচ্ছে। ২০৪৭ সালের মধ্যে দেশকে উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে উৎপাদনশীল ক্ষেত্র এবং প্রতিযোগিতায় সামিল হতে সক্ষম শিল্প সংস্থাগুলির জন্য ভারত ‘সোনার পাখি’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। 

Tags